সাবজেক্ট রিভিউ- #কৃষি
.
.
বাংলাদেশে কৃষি ছাড়া জীবন চলে না। অথচ,পড়বার বিষয়টির নাম যখন কৃষি, বাবা-মা আত্মীয় স্বজন নাক কুচকে বসে থাকেন। কৃষি তে পড়বে ছেলে? জাত চলে যাবে যে! কেন ছেলে ডাক্তার হয়ে রোগীদের সেবা করবে, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বড় বড় দালান বানাবে (যদিও ইঞ্জিনিয়ারের নানা ভাগ, ইঞ্জিনিয়ার মানেই আর্কিটেক্ট না!),, কৃষি তে পড়ে চাষা হতে যাবে কেন? না না হতে দেয়া যাবে না!
.
আমি খুবি তে জিনেটিক্স, জাবি তে ইংরেজি,ইকোনোমিক্স ছেড়ে এসেছি বাকৃবিতে কৃষি পড়তে। নিশ্চয়ই এমনি এমনি আসি নি! কিছু তো একটা ব্যাপার আছে!!
.
এই ব্যাপার গুলো নিয়ে অভিভাবক রা একটু কম সন্ত্রস্ত বলেই দেশে ডাক্টার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ফার্মাসিস্ট, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হবার প্রতি যত টা ক্রেজ, কৃষির প্রতি এত টা ক্রেজ নাই।নাম টাই তো ক্ষ্যাত! কৃষি না হয়ে অন্য কোনো গালভরা ইংরেজি নাম হলে হয়তো আরো কিছু মানুষ আগ্রহী হত! হাসছো? না, আসলেই এমন টা হত!
.
সূচনা অনেক বড় করে ফেললাম, কাজের কথায় আসি। কিছু ভুল ধারণা ভাঙতে হবে আগে।
.
*আমরা অনেকেই ক্লাস সিক্স থেকে এইটে কৃষি শিক্ষা পড়েছি। হাস পালন, মুরগী পালন, পুকুরে মাছ চাষ, আগাছা দমন এসব। এসবের জন্য কি আমাদের বিজ্ঞান এ পড়তে হত? না! এটা সবার জন্যই ছিল। তবে, এমন কি ব্যাপার আছে ভার্সিটি কৃষি বিষয় টি তে যার জন্য শুধুমাত্র বিজ্ঞান এ পড়ে আসা শিক্ষার্থীরাই এপ্লাই করতে পারে?
কেননা সেই কৃষি আর এই কৃষির মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। এই কৃষিতে পড়তে হলে যে, একাধারে বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, কিছু ক্ষেত্রে গণিতেও পারদর্শী হতেই হবে! কৃষি তে ধানের ফলন নিয়ে গবেষণা করতে হয়, মাটির গুণাগুণ নিয়ে গবেষণা করতে হয়, গাছের রোগ নিয়ে ভাবতে হয়, অণুজীববিজ্ঞান, ভ্রূণ কালচার, প্রাণরসায়ন নিয়েও থিসিস করার অসংখ্য পথ আছে।
.
*এগ্রিকালচার কোনো ডিপার্টমেন্ট না। এটি ফ্যাকাল্টি। আমরা কোনো সাবজেক্টে পড়ি না। পড়ি ফ্যাকাল্টি তে। এখানে এসে অন্যান্য প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের বিশাল পার্থক্য।
অ্যা? ফ্যাকাল্টি তে পড়ে কিভাবে ভাইয়া? আমরা তো জানি, ফ্যাকাল্টি হল অনেক গুলো একরকম বিষয় নিয়ে গড়া ভার্সিটির একটি অংশ,যার প্রতিটি বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে ভর্তি হয়ে পড়তে হয়। যেমন, ঢাবির আর্টস ফ্যাকাল্টি, জাবির সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টি। তো, ফ্যাকাল্টি তে পড়ব কিভাবে? ইন্টারেস্টিং!
.
বলছি, আমাদের ফ্যাকাল্টির ভেতরে যত বিষয় আছে, সবগুলোই পড়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক (এক্সসেপ্ট ফিজিক্স, সিড সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি) কোনোটিই কোনোটির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ না! ব্যঙ্গ করে খিচুরি সাবজেক্ট বলতে পারো অনেকে। কিন্তু ভেবে দেখো, আমাদের বিষয় বৈচিত্র কত বেশি! ও হ্যা, আমাদের ফ্যাকাল্টি তে বিষয় সংখ্যা ১৭! সব মিলিয়ে আমাদের পড়তে হয় ২১ টি বিষয়! ভাবা যায়?
.
কি কি বিষয় পড়তে হয়? একটু ধারণা দেই-
১)এগ্রোনমিঃ এগ্রিকালচারের মূল বিষয় বলা হয়। দেশের সিরিয়ালস (ধান, গম প্রভৃতি) নিয়ে ধারণা দেয়া হয় এখানে। কোন সময় কোন ফসল, সেগুলোর ধারণা দেয়া হয়। নিজের প্লট দেয়া হয় যাতে ধান চাষ করতে হয় সম্পূর্ণ নিজ হাতে! ভয়ের কিছু নাই, সবাই পারে যেহেতু, তুমিও পারবে! সিড নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। উইড সায়েন্সের নাম শুনেছ কখনো? আমি নিজেই জানতাম না যে আগাছা এত গুরুত্বপূর্ণ যে যার উপর বিষয় পর্যন্ত রয়েছে! (সাউন্ডস লাইক হগওয়ার্টস  )…
২)সয়েল সায়েন্স- মাটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে পড়তে হয়। এই সাবজেক্ট টি যথেষ্ট দামি! এছাড়া, সয়েল সার্ভে করা শিখতে হয়, ডিটেইল অনেক পড়তে হয়। যে মাটিতে ফসল ফলাবে চাষী, সেই মাটি নিয়ে যদি তোমার ধারণা না থাকে তবে চলবে?
.
৩)হর্টিকালচার- ফল,সবজি, ফুল চাষ নিয়ে পড়াশোনা। সহজবোধ্য কিন্তু গবেষণা-মূলক বিষয়। বাউ কুল এর নাম নিশ্চয়ই শুনেছ… এই ডিপার্টমেন্টের নামকরা বিজ্ঞানী স্যার এম.এ.রহিমের গবেষণার ফসল। এছাড়া এই ডিপার্টমেন্টের অধীনে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জার্মপ্লাজম সেন্টার। সেখানে ড্রাগন ফল, অজস্র আম,,টমেটো, বেগুণের জাতসহ নিত্যনতুন ফসল নিয়ে গবেষণা চলছে নিত্যদিন।
.
৪)ক্রপ বোটানি- বোটানি কে ভুললে চলবে? সেই প্ল্যান্ট সেল, টিস্যু, প্ল্যান্ট এনাটমি। মজাই লাগবে। কারণ হাতে কলমে প্রাকটিস করা অত্যাবশ্যক।
.
৫)এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি- বিভিন্ন সার কারখানায় সারের উৎপাদন, ভেজাল, প্রিজারভেটিভসের গুণাগুণ এসব নিয়ে ধারণা থাকা চাই কমপ্লিট এগ্রিকালচারিস্টের।বায়োগ্যাস চেনো তো? বায়োগ্যাস উদ্ভাবন করেন এই ডিপার্টমেন্টের করিম স্যার।
.
৬)কেমিস্ট্রি- সেই যে জৈব যৌগ, তোমার পিছু ছাড়বে না এখানেও। মুহাহাহা 😎। কিন্তু আকর্ষণীয় হল, ল্যাবরেটরি তে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট এর স্বাধীনতা টা তোমারই!
.
৭)বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি- একটি কমপ্লিটলি মেডিকেলীয় বিষয়। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন,লিপিড-মেটাবলিজম, জীবন খেয়ে ফেলবে! তবু, ভালবাসার জায়গাটা যদি এটিই হয় তবে আর চিন্তা কি!
.
৮)জেনেটিক্স এন্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং- সেই সাইটোলজি, ক্রোমোসোমের গল্প, সেই কোষ বিভাজন। মজার ব্যাপার, এবার নিজের হাতেই মাইক্রোস্কোপে দেখবে সেসব!
.
৯)এনটোমলজি- দেশ এর শুধু? পুরো বিশ্বেই অন্যতম বৈচিত্রময় বিষয় এটি। পোকামাকড় বিদ্যা। ঘাসফড়িঙ, তেলাপোকা, মথ, রেশমপোকা, প্রজাপতি আরো কত কি! কতকিছু জানবে তার ইয়ত্তা নেই। (এক্সাম্পল দিব? লিপ্সটিক তৈরির অন্যতম উপাদান হল ল্যাক ইনসেক্টের বিষ্ঠা  )
.
১০) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স- আমার খুব প্রিয়। ইকোলজি, পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা। অনেক সহজ অবশ্যি!
.
১১) প্ল্যান্ট প্যাথলজি- গাছ নিয়ে কাজকারবার। আর যদি গাছের রোগই না সিলেক্ট করতে পার, তোমাকে বলা হবে বোটানিস্ট, নট এগ্রিকালচারিস্ট! তাই গাছের যাবতীয় রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতেই এই বিষয় তোমার জন্য!
.
১২)বায়োটেকনোলজি- সেই ইন্টারে পড়া টপিক টিই। আরো বিস্তৃত, আধুনিকীকৃত!
.
১৩)এগ্রোফরেস্ট্রি- বন জঙ্গল দিয়ে হাঁটছ, আকাশমনি চেনো না, সেগুন চেনো না। লোকে হাসবে যে! এগ্রোফরেস্ট্রি তোমায় সেসব সেখাবে, নিশ্চিন্ত থাকো!
.
১৪)এগ্রিকালচার এক্সটেনশন এডুকেশন- একজন এগ্রিকালচারিস্ট কিভাবে চাষীদের সামনে নিজেকে প্রেজেন্ট করবে? তার আচরণ কেমন হবে? এসব নিয়ে পড়া আর কি। সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে মিল আছে। সময়ে সময়ে বোরিং লাগবে, আবার মজাও পাবে।
.
১৫)ইংরেজি- বেসিক ইংরেজির উপর কোর্স।
.
১৬)ফার্ম পাওয়ার এন্ড মেশিনারিজ- ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করে এসে এগ্রিতে এলে মন খারাপ করার কিছু নাই। তোমার জন্য মেকানিক্সের বেসিক দিয়ে সাজানো আছে এই কোর্স।
.
১৭)এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিকস- স্ট্যাটিস্টিক্স। গ্রাফ, ম্যাথ, ইকুয়েশন। এগ্রিকালচার— ম্যাথ ভুলতে দেবে না তোমাকে!
.
১৮)রুরাল সোশ্যালজি- নাইন টেনের সমাজ! ইংরেজি তে আর কি 
১৯) এগ্রিচালচারাল ইকোনমিক্স- বেসিক একটি জ্ঞান। পুরাতন চাহিদা, যোগান তো আছেই, আছে নতুন অসংখ্য টপিক।
.
২০) কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং- কোর্স টা গণিত এবং কম্পিউটারের ওপরে। এটাতেও ইন্টারেস্টেড হবে অনেকেই!
.
২১)এনিম্যাল সায়েন্স- প্ল্যান্ট নিয়ে পড়তে পড়তে বিরক্ত লাগলে ইলেক্টিভ এই বিষয় টি চয়েজ করে গবাদি পশুর উপর কোর্স টি করে ফেলতে পারো।
.
.
তো কি বুঝলে? বৈচিত্র্যময়, তাই না?
আর হ্যা, আমাদের কোর্স ১৮৭ ক্রেডিট এর। যারা ক্রেডিটের হিসেব নিয়ে ধারণা কম রাখো তাদের বলছি, দেশের অধিকাংশ বিষয়েই ক্রেডিট ওঠানামা করে ১২০-১৬০ এর মাঝে। অর্থাৎ এখানে ক্রেডিট অনেক বেশি। ক্রেডিট বেশি মানে প্রতি সপ্তাহে ক্লাসের পরিমাণ ও অনেক বেশি, আর চাপ ও তেমন বেশি! তাই ফাঁকিবাজের জন্য নয় কৃষি।
.
.
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ,পটুয়াখালি,নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি আছে।
.
সবাই এখন যে কথা টি বেশি জানতে চায়, তা হল, জব ফ্যাসিলিটি কেমন?
.
আমি নিজে এজ ওয়েল এজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক ও অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করি, মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া দের থেকে ও কৃষির চাকরীর সুযোগ ভাল! কৃষিবিদ রা প্রথম শ্রেণির অফিসার (ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মতই)।কৃষির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় আলাদা কোঠা আছে, যে কেউ চাইলেই খুব সহজে উপজেলা কৃষি অফিসার হয়ে যেতে পারে। সত্যি বলতে, এটি সর্বাপেক্ষা সাধারণ চাকুরি!!! যারা কৃষি তে পড়ে, তারা ইজিলি বিসিএস উৎরায়, এটি প্রমাণিত সত্য, বিগত বছর গুলোর রেজাল্ট তাই ই বলে, এছাড়াও প্রতি বছর পাস করা ৭% শিক্ষার্থী শিক্ষক হয়ে জয়েন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাদের শিক্ষক হবার খুব ইচ্ছা অথচ ৭% এ আসতে পারে নাই, তারা বাইরের দেশের এডজাংড প্রফেসর হয়ে আসছে এমন অনেক নজির আছে। এছাড়া হতে পারে বিজ্ঞানী। BARI, BINA, BRRI, SRDI,BARC, BJRI, BSRI সহ অজস্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট রয়েছে দেশেই, এবং স্রষ্টার ইচ্ছায় তাদের অনবদ্য কর্মকুশলতায়, দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এছাড়া বিভিন্ন দেশে কাজ করার সুবর্ণ সুযোগ তো আছেই।
.
ব্যাংকিং সেক্টর, সেখানেও কৃষির শিক্ষার্থী প্রচুর।
.
মিল্ক ভিটা, স্কয়ার প্রভৃতিতে জব পাওয়া যায়, সাফারি পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন এসবে কিউরেটর হয় কৃষিবিদ রা। সত্যি বলতে কৃষির এত এত জায়গা আছে যে, বলে শেষ করা যাবে না। হাতের কাছে কৃষি গাইড থাকলে উল্টিয়ে দেখ, কত কত সেক্টরে জব পাবে কৃষির স্টুডেন্ট রা!
.
.
সবার প্রতি তথাকথিত ‘চাষা’র বিষয় পড়ার আমন্ত্রণ রইল, সমালোচক দের মুখ টা চাকুরী পাবার পরেই নাহয় বন্ধ কোরো!!!!
.
.
স্বাগতম সবাইকে 
©Maruful Anam Rangon
Agriculture,
Bangladesh Agricultural Universit