অভিনন্দন জাফর ইকবাল স্যার, শেষ পর্যন্ত আপনার বস্তা-পচা আবেগের কাছে বৈজ্ঞানিক যুক্তির পরাজয় হলো।

আপনার প্রস্তাবিত ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলাতেই বাংলাদেশ সরকার ২১৩ কোটি টাকা খরচ করে মানমন্দির স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় আপনাকে অভিনন্দন। বাংলাদেশ সরকারের কর্তাব্যাক্তিদের আপনার বস্তা-পচা যুক্তি গ্রহন করায় আবারও প্রমানিত হলো “Common sense is like deodorant, those who need it the most never use it.”

গতকাল ১৯ জানুয়ারি এটি একনেকে পাশ হয়। [ Bangladesh to build 1st space observatory center; The proposal has been accepted by Prime Minister Sheikh Hasina, and the Tk 213 crore project is expected to begin under the authority of the Ministry of Science and Technology. This observatory will be built on 10 acres of land, with a five-storey circular building with reflector telescopes, classrooms, laboratories, office rooms, and accommodation facilities.]

 

 সাম্প্রতিক কালে জাফর ইকবাল স্যারের লেখাগুলোর বেশিভাগই হলও মানহীন ও যুক্তিহীন আবেগমিশ্রীত লেখা। যার সর্বশেষ উদাহরণ হলও জ্যোতি-পদার্থ বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার জন্য ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় জাতীয় মানমন্দির সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা। ২০১৯ এর ২৭ জুন “একটি স্বপ্ন” নামে প্রকাশিত জাফর ইকবাল স্যারের বৈজ্ঞানিক যুক্তিহীন প্রস্তাবনার বিপরীতে ২০১৯ সালের ১০ই জুলাই আমি বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলাম যে ফরিদপুর জেলা হবে মানমন্দির স্থাপনের জন্য সারা বাংলাদেশের নিকৃষ্টতম স্থান। সেই লেখাটি আবার তুলে ধরছি।

মোস্তফা কামাল পলাশ: যে দেশের প্রায় ৪৩টি পাবলিক এবং ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনটিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রোনমির কোনও স্নাতক ডিগ্রি পড়ানো হয়না সেই দেশে উনি শত কোটি টাকা খরচ করে জ্যোতি-পদার্থ বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার জন্য একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কলাম লিখেছেন। স্যারের প্রস্তাবনা শুনে গ্রাম বাংলার জনৈক সওদাগরের ঘোড়ার পূর্বে চাবুক কেনার গল্পের কথা মনে পড়ে গেল।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলাদেশে কেয়েকটা সৌখিন ক্লাব ও সেগুলোর সাথে জড়িত কিছু সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চাকারি সেচ্ছাসেবী থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক পড়া-লেখা করা মানুষ আদৌ আছে কি না আমি সন্দিহান। আমি নিজেও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঐ রকম একটা ক্লাবের “Shahjalal University Astronomical Society” সাথে জড়িত ছিলাম। শুধু জড়িত ছিলাম বললে কম বলা হবে।

পর্যায়ক্রমে ঐ ক্লাবের প্রচার সম্পাদক, সহ-সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি ছিলাম। ঐ ক্লাবের আন্ডারে শাবিপ্রবিতে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কর্মশালা আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছি; ও প্রথম টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্হা করেছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্হা করতে গিয়ে জাফর ইকবাল স্যারের পর্যাপ্ত অ-সহযোগিতা নিয়ে তিক্ত অবিজ্ঞ হয়েছিল যা অন্য একদিন শেয়ার করার আশা রাখি।

যাই হউক, একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে জাফর ইকবাল স্যারের মানমন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত প্রস্তাবনাটা অনেক হাস্যকর শোনালেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে প্রস্তাবনাটা প্রশংসা পেতে পারে এই ভেবে যে বাংলাদেশে কোন কিছু প্রস্তাব করলেই তো আর হয় না; যেমন পাকিস্তান পিরিয়ডে ১৯৬৫ সালে কাজ শুরু করা রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে প্রস্তাবনার প্রায় ৫০ বছর পরে।

জাফর ইকবাল স্যারের লেখার সবচেয়ে মানহীন, যুক্তিহীন, ও হাস্যকর অংশটা হলও প্রস্তাবিত জাতীয় মানমন্দিরটি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় স্থাপনের প্রস্তাব করা। ঐ স্থানে মানমন্দিরটি স্থাপনের প্রধান যুক্তি হিসাবে যে কারণটি দেখিয়েছেন তা হলও

“আমার কাছে মনে হয়েছে কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদবিন্দু এই জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় এটি সারা পৃথিবীর একমাত্র এরকম একটি জায়গা। মাদাগাস্কার উপর দিয়ে মকর ক্রান্তি গিয়েছে এবং শুনেছি সেটাকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের বেলায় শুধু কর্কট ক্রান্তি নয় তার সাথে ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাও আছে এবং সেটি একটি নির্দিষ্ট বিন্দু। বলা যেতে পারে এটি হচ্ছে একটা মানমন্দির তৈরি করার জন্য একেবারে আদর্শ-তম জায়গা।”

বাস্তবতা হলও যে মানমন্দির স্থাপনের জন্য কোন স্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ কোন প্রধান বিবেচ্য বিষয় না। এমনকি প্রধান ২০ বা ৩০ বিষয়ের একটিও না। মানমন্দির স্থাপনের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলও কোন স্থানের আবহাওয়া, জলবায়ু ও সমুদ্র সমতল থেকে উচ্চতা। সত্য কথা বলতে কি বাংলাদেশের প্রথম মানমন্দিরটি ফরিদপুর জেলার স্থাপনের প্রস্তাব করেছে জাফর ইকবাল স্যারের মতো মানুষ তা দখে আর তার ঐ লেখাটা পুরো পড়ে দেখার আগ্রহ উবে গিয়েছিল।

আমি কেন বলছি যে ফরিদপুর জেলায় দেশের প্রথম মানমন্দিরটি স্থাপন মানহীন যুক্তি ও হাস্যকর প্রস্তাবনা তার বিস্তারিত লিখেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিজ্ঞান বিষয়ক জনপ্রিয় লেখক Farseem Mannan Mohammedy স্যার। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রোনমি বিষক প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পথিকৃতও বলা চলে উনাকে। বাংলা ভাষায় জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক একাধিক বই লিখেছেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী।

জাফর ইকবাল স্যারের প্রস্তাবিত মানমন্দির ফরিদপুর জেলায় স্হাপনের সাথে দ্বীমত প্রকাশ করে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী স্যার  ৭ ই জুলাই, ২০১৯ “জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা এবং জাতীয় মানমন্দির স্থাপনা বিষয়ে” শিরোনামে একটি মতামত প্রকাশ করেছেন। ফারসীম স্যারের লেখার কিছু অংশ কোট করলাম:

“মানমন্দির স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে- আবহমণ্ডলীয় সুস্থিতি, পরিষ্কার আকাশ মেঘমুক্ত থাকার অনুপাত, বাতাসের প্রবাহ-আর্দ্রতা-ঘনত্ব, বাতাসে অ্যারোসল কিংবা অন্য কণার উপস্থিতি এবং দূষণ-মুক্ত (ধূলি ও আলো) পরিবেশ, উঁচু স্থান, কিছুটা লোক-বর্জিত নির্জনতা, আর্দ্রতা-মুক্ত আবহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈকট্য ও গবেষণা-পরিচালনার সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় রসদের সুলভতা ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভূমির সিসমিক সক্রিয়তা, বন্যা ও অন্যান্য মানদণ্ড। এইরকম প্রায় ১১টি সুনির্দিষ্ট শর্তের [২] বহুমাত্রিক সিদ্ধান্ত (multi-criteria decision analysis) বিবেচনার (এর কোনোটি না হলে হবে না এমন নয়, তবে কিছু শর্তের প্রয়োজন আছে যদি আপনি প্রকৃত পর্যবেক্ষণ, পরিমাপন ও ডেটা সংগ্রহে আগ্রহী হন) মাধ্যমে মানমন্দিরের স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত।”

 

আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে অল্প কিছুদিন পূর্বে জ্যোতি-পদার্থ বৈজ্ঞানিকরা প্রথম বারের মতো ব্ল্যাক-হোল এর ছবি প্রকাশ করেছিল। সেই ছবি তুলা হয়েছিল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বিশাল আকারের ৮ টি রেডিও-টেলিস্কোপের (যে টেলিস্কোপ দ্বারা অন্য গ্রহ-উপগ্রহ থেকে আগত রেডিও তরঙ্গ গ্রহণ করা হয়) সাহায্যে যেগুলোকে সমন্বিত ভাবে বলে Event Horizon Telescope। ঐ ৮ টি রেডিও-টেলিস্কোপের ২ টি চিলিতে, ৩ টি আমেরিকায়, ১ টি স্পেনে, ১ টি মেক্সিকো ও ১ টি দক্ষিণ মেরুর বিভিন্ন পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত।

ঐ ৮ টি টেলিস্কোপের নাম ও সেগুলো কোন উচ্চতায় অবস্থিত তা নিম্নে উল্লেখ করা হল।

The Atacama Large Millimeter/submillimeter Array (ALMA) (চিলির আতাকামা মরুভূমির উপরে অবস্থিত; উচ্চতা ৫ হাজার ৬০ মিটার)

The Atacama Pathfinder Experiment (APEX) (চিলির আতাকামা মরুভূমির উপরে অবস্থিত; উচ্চতা ৫ হাজার ১০০ মিটার)

La Silla Observatory in Chile

Heinrich Hertz Submillimeter Telescope (আমেরিকার অ্যারিজোনা রাজ্যের একটি পর্বতের ৩ হাজার ১৮৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত)

James Clerk Maxwell Telescope (আমেরিকার হাওয়াই রাজ্যের মাউনা কেয়া পর্বতের ৪ হাজার ৯২ মিটার উচ্চতার একটি শীর্ষে অবস্থিত)

The Submillimeter Array (SMA) (আমেরিকার হাওয়াই রাজ্যের মাউনা কেয়া পর্বতের ৪ হাজার ৮০ মিটার উচ্চতায় একটি শীর্ষে অবস্থিত)

The Large Millimeter Telescope (মেক্সিকোর একটি পাহাড়ের ৪ হাজার ৬৪০ মিটার উচ্চতার একটি শীর্ষে অবস্থিত)

IRAM 30m telescope (স্পেনের একটি পাহাড়ের ২ হাজার ৮৫০ মিটার উচ্চতার একটি শীর্ষে অবস্থিত)

The South Pole Telescope (SPT) (দক্ষিণ মেরুর একটি পাহাড়ের ২ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতার একটি শীর্ষে অবস্থিত)

উপরে বর্নিত ৮ টি রেডিও-টেলিস্কোপ হতে প্রাপ্ত ছবি কম্পিউটার আ্যালগরিদম এর সাহায্যে একিভূত করে সেই ছবি সংশোধন করে মূল ব্লাক-হোল এর Event Horizon এর ছবি পাওয়া গিয়েছে। নিচে সংযুক্ট ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিভাবে স্তরে-স্তরে সম্পূর্ন কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

The Event Horizon Telescope: How It Works

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন কেন মহাকাশ গবেষণার জন্য স্থাপিত টেলিস্কোপগুলো সাধারণ স্থানে না বসিয়ে পাহাড়ের শীর্ষে স্থাপন করা হয়ে থাকে? উত্তটা আপনার পড়া স্কুল জীবনের সাধারণ বিজ্ঞান কিংবা ভূগোল বই এ পড়েছেন। মনে করিয়ে দিচ্ছি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অন্যতম উপাদান হলও জ্বলিয় বাষ্প। যে জ্বলিয় বাষ্প সময়ে সময়ে ঘনীভূত হয়ে প্রথমে মেঘে পরিণত হয় ও এর পরে বায়ু সম্পৃক্ত হলে বৃষ্টি আকারে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তরকে বলে ট্রপোসফেয়ার যার উচ্চতা পৃথিবী পৃষ্ট থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৬ কিলোমিটার।

পৃথিবী পৃষ্ট থেকে যদি ১২ কিলোমিটার উচ্চতার মই তৈরি করা হয় ও সেই মই মেয়ে আপনি উপরে উঠতে থাকেন তবে প্রতি কিলোমিটার উপরে উঠার ফলে তাপমাত্রা প্রায় ১০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড কমতে থাকবে। এই একই কারণে প্রায় ৯ কিলোমিটার উচ্চতার হিমালয় পর্বতের উপরে তাপমাত্রা থেকে মাইনাস ৪০ থেকে ৬০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। বিজ্ঞান বইতে আপনারা আর একটা বিষয় শিখেছেন যে গরম বাতাসের জ্বলিয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বেশি ঠাণ্ডা বাতাস অপেক্ষা।

যেহেতু বহু-পৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে বাতাসের তাপমাত্রা কমতে থাকে তাই বহু-পৃষ্ঠ অপেক্ষা উপরের বাতসে জ্বলিয় বাষ্পের পরিমাণও কমতে থাকে। মাইনাস ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বাতাসে জ্বলিয় বাষ্পের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

কোন স্থানে মহাকাশ গবেষণার জন্য স্থাপিত টেলিস্কোপগুলো বসানোর প্রধান শর্ত হলও ঐ স্থানের বাতাসে জ্বলীয় বাষ্পের পরিমাণ কত কম। যে কারণে প্রতিটি দেশ মহাকাশ গবেষণার জন্য টেলিস্কোপগুলো স্থাপন করলে সেই দেশের সবচেয়ে উঁচু স্থানটি নির্বাচন করে যাতে করে অন্য গ্রহ-উপগ্রহ থেকে আগত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বাতেসে অবস্থিত জ্বলিয় বাষ্প দ্বারা সর্বনিম্ন পরিমাণ শোষিত হয়। পৃথিবী পৃষ্ঠের যে কোন স্থানে টেলিস্কোপ স্থাপন করা হউক না কেন অন্য গ্রহ-উপগ্রহ থেকে আগত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বাতেসে অবস্থিত জ্বলিয় বাষ্প দ্বারা শোষিত হওয়ার সমস্যা থেকেই যায়।

যে সমস্যাটি দূর করার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মহাকাশে একটি টেলিস্কোপ পাঠাতে যাচ্ছে ব্ল্যাক হোলের ছবি (নির্দিষ্ট করে বলতে বলতে হয় ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের ছবি) আরও নিখুঁত ভাবে তোলার জন্য। ভূ-পৃষ্ঠের জ্বলিয় বাষ্প সমস্যার জন্য যে একই কারণে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ইতিমধ্যেই মহাকাশে পাঠিয়েছে হাবল টেলিস্কোপ ও আগামীতে পাঠানো প্রস্তুতি নিচ্ছে James Webb Space Telescope। উপরে দেখেছেন ব্ল্যাক-হোল এর ছবি তুলার জন্য যে ৮ টি টেলিস্কোপ ব্যব হার করা হয়েছে তার ২ টি চিলির আতাকামা মরুভূমিতে স্থাপন করা।

এখানে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে চিলির আতাকামা মরুভূমি হলও পৃথিবীর দুই মেরু ব্যতীত মূল ভূখণ্ডের শুষ্কতম স্থান। এই মরুভূমিতে এমনও স্থান রয়েছে যে স্থানে সারা বছরে কোন বৃষ্টিপাত হয় না। ঠিক এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীতে মহাকাশ গবেষণায় শীর্ষস্থানীয় প্রায় প্রতিটি দেশ নিজস্ব গবেষণা টেলিস্কোপ বসিয়েছে সেখানে।

কোন স্থানে মহাকাশ গবেষণার জন্য স্থাপিত টেলিস্কোপগুলো বসানোর আর একটি প্রধান শর্ত হলও ঐ স্থানের বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে উপস্থিত ধূলি-কণা, রাসায়নিক পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যেগুলোকে সমন্বিত ভাবে এরোসল কণা বলে তাদের পরিমাণ। বাংলাদেশের বায়ু দূষণ নিয়ে যারা গবেষণা করে বা সামান্যতম ধারণা রাখে তারা জানেন যে সারা বাংলাদেশের মধ্যে বায়ুতে সবচেয়ে বেশি এরোসল কণার উপস্থিতি থাকে ঢাকা থেকে দেশের পশ্চিম অঞ্চলের জেলা গুলোতে। বায়ু দূষণ পরিমাপের জন্য যে সূচক ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা হলও প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটার এর পরিমাণ।

এক ঘনমিটারের মধ্যে কত মাইক্রোগ্রাম পার্টিকুলেট ম্যাটার আছে। পার্টিকুলেট ম্যাটার হলও বাতাসের মধ্যে বিভিন্ন ধূলি কণা, ময়লা, আবর্জনা, লতা-পাতার ভগ্নাংশ, ফুলে রেণু ইত্যাদিকে বুঝায়। সাইজ অনুসারে পার্টিকুলেট ম্যেটারকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে: ব্যাস ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার (PM 2.5) বা তার চেয়ে ক্ষুদ্র ও ১০ মাইক্রোমিটার এর চেয়ে ছোট। ১ মাইক্রোমিটার হলও ১ মিটারের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ বা ১ মিলিমিটারের ১ হাজার ভাগের এক ভাগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে গ্রহণযোগ্য ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার দৈর্ঘ্যের পার্টিকুলেট ম্যাটার এর পরিমাণ এক ঘনমিটারের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম ও ১০ মাইক্রোমিটার ব্যাস এর পার্টিকুলেট ম্যাটার এর পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারের সর্বোচ্চ ২০ মাইক্রোগ্রাম। PM 2.5 এতটাই ক্ষুদ্র যে তা চোখে দেখা যায় না। ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এম এম হক ও তার সহযোগীরা ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর গাজীপুরে PM 2.5 এর ঘনত্ব পেয়েছে প্রতি ঘনমিটারে ২৩১ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম ও ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় PM 2.5 এর ঘনত্ব পেয়েছে ২৪৬ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম।

অর্থাৎ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় ২৫ গুন বেশি পরিমাণ PM 2.5 বিদ্যমান ঢাকার ও তার চার পাশের শহর গুলোতে। PM 10 এর ঘনত্বও ১৫ থেকে ২৫ গুন বেশি।

 

নিচে বাংলাদেশের আকাশে PM 2.5 এর ঘনত্ব এর পরিমাণ এর একটি মানচিত্র সংযুক্ত করলাম যে মানচিত্রটি আমি নিজে তৈরি করেছি আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এর কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ হতে প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করে সেই সাথে নাসার কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ হতে প্রাপ্ত একটি চিত্রও সংযুক্ত করে দিলাম যা থেকে ভারত ও বাংলাদেশের আকাশে বায়ু দুষনের পরিমান বোঝা যায়। এই চিত্র হতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে ফরিদপুর জেলার আকাশে ব্যাপক পরিমাণ এরোসল কণা উপস্থিত থাকে ও বাংলাদেশের অন্যতম বায়ু দুষিত এলাকা। একই মাচিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবন, খগড়াছতি ও রাঙ্গামাটি জেলা হলও সারা বাংলাদেশের সবচেয়ে কম বায়ু দূষণ সম্পন্ন জেলা। একই সাথে এই জেলা ৩ টি সমুদ্র সমতল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত।

এইবার ভেবে দেখুনতো জাফর ইকবাল স্যার বাংলাদেশের প্রথম মানমন্দিরটি স্থাপনের জন্য ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলাকে মনোনীত করেছে তা উপরে বর্ণিত টেলিস্কোপের প্রধান ৩ টি শর্ত (উচ্চতা, বাতাসে জ্বলিয় বাষ্পের পরিমাণ, ও বাতাসে এরোসল কণা উপস্থিতি) পূরণ করে কি না?

টেলোষ্কোপ স্থানের অন্য একটি শর্ত হলও লোকালয় ও কৃত্রিম আলো উৎস থেকে মানমন্দিরের স্থানটি যেন যথেষ্ট দূরে অবস্থিত হয় যাতে করে শহরের কৃত্রিম আলো, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্হা ও প্রচার মাধ্যমে তরঙ্গ অন্য গ্রহ-উপগ্রহ থেকে আগত রেডিও তরঙ্গকে দুষিত না করে। আরও ডজন সংখ্যা ব্যাখ্যা প্রদান করা যাবে যে জাফর ইকবাল স্যার প্রস্তাবিত ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলা মহাকাশ গবেষণার জন্য টেলিস্কোপগুলো স্থাপনের জন্য কোন আদর্শ স্থান না; এমনকি বলা চলে সারা বাংলাদেশের সবচেয়ে অ-যোগ্য স্থান।

আশা করি বাংলাদেশ সরকার প্রস্তাবিত “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির” স্থাপন করার জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে আদর্শ স্থানটিকে নির্বাচন করবেন যুক্তিহীন আবেগ বর্জন দিয়ে। যুক্তিহীন আবেগ দিয়ে আর যাই হউক বিজ্ঞান চর্চা হয় না এই কথাটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো তত দ্রুত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। নইলে বরাবরের মতো এশিয়ার দেশ গুলোর লিস্টে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছন দক থেকেই প্রথম হতে হবে নিয়মিত ভাবে; যে স্থানে আমরা ইতিমধ্যেই অবস্থান করছি।

লেখকঃ Mostofa Kamal Palash, ১০ই জুলাই, ২০১৯

Member, Board of Directors at USSU Childcare Centre

Studied Environment and Sustainability at University of Saskatchewan

Studied Atmospheric Physics at ICTP: International Centre for Theoretical Physics

Studied Earth & Environmental Sciences at University of Waterloo

Studied BSc at Shahjalal University of Science and Technology

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী স্যারের মূল কলাম পড়ার জন্য নিচে সংযুক্ত করলাম।

==========================================

 ৭ ই জুলাই, ২০১৯ : বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা চলছে গুটিগুটি পায়ে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ নেই। তার কারণ দেশের প্রায় ৪৩টি পাবলিক এবং ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রনমির কোনও স্নাতক ডিগ্রি পড়ানো হয়না। এটা একদিক থেকে আমাদের শিক্ষামানসের মনোলিথিক অভিমুখিনতা নির্দেশ করে। আমাদের অধীত বিষয়গুলি প্রায় সবই উপযোগিতা দ্বারা চিহ্নিত, বিদ্যাচর্চার প্রয়োজনীয়তার দ্বারা নয়। ফলে সারা বিশ্বে মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে যে গতিশীল আবহ বিরাজ করছে- শিক্ষায়, গবেষণায়, মহাকাশ জয়ে – আমাদের সেসবের প্রাতিষ্ঠানিক কোনও সুযোগ নেই। দুই-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান কিংবা কসমোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর গবেষণার সুযোগ থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এই বিষয়ক কোর্স পড়াতে হবে, গবেষণার প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে। কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠন করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাস্ট্রনমি বিষয়ে স্নাতক কোর্স এবং জনপ্রিয়করণের কর্মকাণ্ড হাতে নিতে হবে। এমনটাই বলা আছে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট-কৃত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা ২০১২-র বিভিন্ন উপধারায় [দেখুন ২২, ২৯, ৬৬, ৭৪, ৭৮, ১০৬, ১৩৫, ১৪১, ১৫১, ১৫২ নং উপধারা]  [১]।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব থাকলেও দেশে উৎসাহী সৌখিন জ্যোতির্বিদ্যা-চর্চাকারীদের চর্চা থেমে নেই। সেই আশির দশকে হ্যালির ধূমকেতু আবির্ভাবের পর থেকে দেশে অন্তত তিনটি প্রধান সংগঠন জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে সভা-সমিতি, কর্মশালা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে চলেছে। এই ধারাটি খুব পুষ্ট নয়, কেননা প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে এতদবিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান সৃষ্টি করা যায়না।

ব্যক্তিগত অনুদান ভিত্তিক সীমিত চর্চার মাধ্যমে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকুই হচ্ছে। ইদানিং সোশাল মিডিয়ার আবির্ভাবের ফলে প্রধান ধারার বাইরেও কিছু স্থানীয় উৎসাহী তরুণ-তরুণী জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু কাজ করেন, অ্যাস্ট্রো-অলিম্পিয়াড হয়। কিন্তু ধারাবাহিক ঐতিহ্য আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে হলে কিংবা বহির্বিশ্বের গবেষণার সাথে তাল মেলাতে হলে এখনই আমাদের তিনটি ব্যাপারে নজর দেওয়া প্রয়োজন – ১. বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলামে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ সংক্রান্ত বিষয়াদি সংযোজন, ২. একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠন এবং ৩. একটি জাতীয় মানমন্দির বা ন্যাশনাল অবজার্ভেটরি নির্মাণ। এই তিনটি বিষয়ই প্রাগুক্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা ২০১২-য় অন্তর্ভুক্ত আছে [বিশেষ করে ৭৮, ১৪১, ১৫১, ও ১৫২ উপধারায়]।

সুখের বিষয়, এই উদ্দেশ্য-ত্রয়ীর শেষেরটি নিয়ে সম্প্রতি সরকার বাহাদুর চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক একটি মানমন্দির আমাদের জন্য এখন একটি সময়ের দাবি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডও এখন জ্যোতির্বিজ্ঞান-চর্চায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। চীন ও ভারতের কথা বাদই রাখি, কেননা তারা এই বিষয়ে এখন সারা পৃথিবীর কাছে নমস্য।

আমি উল্লেখ করতে চাই, মঙ্গোলিয়া এবং ভুটান সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ভুটানের জন্য একটি জাতীয় মানমন্দির কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে থাইল্যান্ডের জাতীয় প্রতিষ্ঠান (NARIT) একাডেমিক এবং প্রায়োগিক সাহায্য করছে, আমি জেনেছি।

সম্প্রতি আমাদের দেশে ধর্মীয় উৎসবের দিন ধার্য করতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, এটা আমরা সবাই জানি, এবং এটা যে পর্যবেক্ষণ বিষয়ে জ্ঞানের খামতি থেকে সেটা আমরা হয়ত বুঝতে পেরেছি। এই প্রসঙ্গেই আমরা কয়েকটি মাধ্যমে কয়েকবার বলবার চেষ্টা করেছি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করে একটি জাতীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জ্যোতিষ্ক সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের অসুবিধাদি দূর হবে, যদি অবশ্য আপনি দুরবিনে চোখ রাখতে আগ্রহী হন।

এই প্রসঙ্গেই স্বনামধন্য এবং জনপ্রিয় অধ্যাপক মুহমদ জাফর ইকবাল গত ২৭ জুন ২০১৯ একটি লেখার [একটি স্বপ্ন] মাধ্যমে জাতীয় মানমন্দির সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা এবং তৎসংক্রান্ত একটি সুলিখিত এবং যুক্তিপূর্ণ ভাব-পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। সেখানে প্রথম আমরা জানতে পারলাম যে সরকার বাহাদুর একটি মানমন্দির করার কথা সত্যিই ভাবছেন। ফলে আমরা যারা দীর্ঘদিন একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলাম বা এ সংক্রান্ত কিছু কাজ করেছিলাম, তাদের জন্য এ এক অসম্ভব সুসংবাদ।

জানিয়ে রাখা যেতে পারে, প্রয়াত অধ্যাপক ড এ আর খানের [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি] নেতৃত্বে একটি টিম টেকনাফ ও কক্সবাজার এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলসমূহ ম্যাপিং করে এসেছিল সেই ২০১০ সালের দিকে। পরবর্তীতে মানমন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত একটি খসড়া আমরা তৈরি করেছিলাম যার বাজেট ছিল ২০০ কোটি টাকা। মূল ধারণাপত্রটি তৈরি করেছিলেন  এফ. আর সরকার (প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটি) যেখানে একটি ২ দশমিক ৩ মিটার ব্যাসের প্রতিফলক টেলিস্কোপ এবং ৫০ একর জায়গা, ভবনাদি নির্মাণ, মিউজিয়াম এবং একটি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ একটি বিশদ খসড়া ছিল।

উক্ত খসড়া প্রস্তাবে মানমন্দির বা ‘অবজার্ভেটরি’ বলতে আমরা বৈনু বাপ্পু মানমন্দির (কাভালুর, ভারত), পালোমার মানমন্দির কিংবা গ্রিফিথ মানমন্দির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকাল অবজার্ভেটরি অব জাপান (মিতাকা, টোকিও), রয়াল গ্রিনউইচ মানমন্দির (যুক্তরাজ্য) ইত্যাদির কথা মাথায় রেখেছিলাম। মানমন্দির স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে- আবহমণ্ডলীয় সুস্থিতি, পরিষ্কার আকাশ মেঘমুক্ত থাকার অনুপাত, বাতাসের প্রবাহ-আর্দ্রতা-ঘনত্ব, বাতাসে অ্যারোসল কিংবা অন্য কণার উপস্থিতি এবং দূষণমুক্ত (ধূলি ও আলো) পরিবেশ, উঁচু স্থান, কিছুটা লোক-বর্জিত নির্জনতা, আর্দ্রতামুক্ত আবহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈকট্য ও গবেষণা-পরিচালনার সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় রসদের সুলভতা ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভূমির সিসমিক সক্রিয়তা, বন্যা ও অন্যান্য মানদণ্ড। এইরকম প্রায় ১১টি সুনির্দিষ্ট শর্তের [২] বহুমাত্রিক সিদ্ধান্ত  (multi-criteria decision analysis) বিবেচনার (এর কোনোটি না হলে হবে না এমন নয়, তবে কিছু শর্তের প্রয়োজন আছে যদি আপনি প্রকৃত পর্যবেক্ষণ, পরিমাপন ও ডেটা সংগ্রহে আগ্রহী হন) মাধ্যমে মানমন্দিরের স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত।

এগুলো ছাড়াও কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার রয়েছে আরো কিছু সম্পূরক শর্তাবলি। যেমন চীন-ভিত্তিক এশিয়া-প্যাসিফিক স্পেস কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (Asia-Pacific Space Cooperation Organization, APSCO, http://www.apsco.int/) বাংলাদেশের জন্য একটি বড় টেলিস্কোপ বসাতে আগ্রহী। তারা মানমন্দির স্থান-নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত যেসব শর্ত দিয়েছে তার কয়েকটি হলো – বছরে ন্যূনতম ২৭০ দিন পরিষ্কার রাতের-আকাশ থাকতে হবে, রাতের আকাশে প্রতি বর্গ আর্ক-সেকেন্ডে উজ্জ্বলতার মান ২০-এর কম হতে হবে, দুরবিনের ভিত্তিকে অনুভূমিক ধরে ১০ ডিগ্রি কৌণিক উচ্চতার উপরে কোনো বাধা থাকতে পারবে না, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দর্শন-যোগ্যতার প্যারামিটার (astronomical seeing parameter) ২ আর্ক-সেকেন্ড বা তার কম ইত্যাদি।

এছাড়াও গভর্নেন্স, ম্যানেজমেন্ট, লজিস্টিকস ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার (বিদ্যুতের চাহিদা, ডেটার চাহিদা, রসদ ও নির্মাণ-সামগ্রীর প্রাপ্যতা ও সরবরাহ, জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার থেকে দূরত্ব, খোলামেলা স্থান ইত্যাদি) বিষয়ে তাদের রয়েছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। এইসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কয়েকটি স্থানের সুপারিশ করা যেতে পারে – কক্সবাজার-টেকনাফ পাহাড়ি অঞ্চল, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সিলেটের জৈন্তা পাহাড়ি অঞ্চল এবং ময়মনসিংহের গারো পার্বত্যভূমি তাদের অন্যতম।

এর জন্য প্রয়োজন একটি যথোপযুক্ত ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (GIS) এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তিসমূহের সহায়তায় একটি সমন্বিত কার্যক্রম যা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, পেশাদার এবং সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দুরবিন ব্যবহার করেছেন বা অ্যাস্ট্র-ইন্সট্রুমেন্টেশনে অভিজ্ঞ এমন কেউ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওয়াকিবহাল এমন কয়েকজনের সহায়তা, অন্তর্ভুক্তি এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে করতে হবে।

এটা একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান হবে যা জাতির জন্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গর্বের বিষয়বস্তু হবে। মানমন্দির প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তার বিষয়ে চীন, জাপান এবং থাইল্যান্ডের আগ্রহ আছে বলে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি। বিশেষ করে, চীন এখন আমাদের বিশেষ উন্নয়ন সহযোগী আর জাপান আমাদের পুরনো বন্ধু। ফলে এ দুটো অভিজ্ঞ রাষ্ট্রকে আমরা এই কাজে সাথে পাব। মাননীয় সরকার বাহাদুর এটা নিশ্চয় ভেবে দেখবেন।

এই আলোচনায় বোঝা যায় একটি জাতীয় মানমন্দির ঠিক কীভাবে কোথায় তৈরি করা যেতে পারে। দুঃখের বিষয়, অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার কর্তৃক উত্থাপিত এবং প্রস্তাবিত “কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুটি” কোনোক্রমেই একটি জাতীয় মানমন্দিরের জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে না, কেননা এটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো গুরুত্ব বহন করেনা।

মনে রাখতে হবে, দ্রাঘিমা রেখাগুলি মানুষের প্রয়োজনানুযায়ী কল্পিত, সময় রক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য উপযুক্ত, এর সাথে জ্যোতিষ্কের পর্যবেক্ষণ বা মানমন্দির পরিচালিত আলোকীয় ও বেতার তরঙ্গের গবেষণা একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয়।

এই ছেদবিন্দুটিতে মানমন্দির তৈরি প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার (IAU) প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর পিয়েরো বেনভেনুটি জানিয়েছেন “একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরের জন্য ৯০-ডিগ্রি পূর্ব-দ্রাঘিমা এবং কর্কটক্রান্তি রেখার ছেদবিন্দুটির কোনো আলাদা গুরুত্ব নেই। মহাকাশের খ-গোলকের দৃশ্যমানতায় দ্রাঘিমার কোনো প্রভাব নেই, তবে অক্ষাংশের আছে। …সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো  স্থানটিতে পরিষ্কার-আকাশ-যুক্ত রাতের সংখ্যা: এই ডেটা সহজেই পাওয়া যাওয়ার কথা।

অন্য বিষয়গুলি হল কম আলোক দূষণ এবং কম মাত্রার আপেক্ষিক আর্দ্রতাঃ তোমাদের দেশটি মূলত সমতল ভূমি এবং মৌসুমী জলবায়ু অধ্যুষিত বিধায় বড় টেলিস্কোপ বসানোর জন্য আদর্শ ভূমি নয়। তবে একটি শিক্ষানবিস টেলিস্কোপ বসিয়ে যদি অ্যাস্ট্রনমি প্রোমোট করতে চাওয়া হয় তবে নন-আইডিয়াল কনডিশন বিবেচনা করা যেতে পারে। এখনকার আধুনিক এক-মিটার টেলিস্কোপগুলি সিরিয়াস গবেষণার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত (উপরোক্ত পারিবেশিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই)” [৩]।

উক্ত বিমূর্ত ছেদবিন্দুটিতে একটি চিহ্নরেখা রাখা যেতে পারে, বা একটি স্তম্ভ যা ভূগোল শিক্ষার জন্য কিংবা বৈজ্ঞানিক আমোদের জন্যেও উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু কোনোক্রমেই মানমন্দির নয়। আরেকটি কথা, ভাঙ্গা উপজেলা যেহেতু পদ্মা সেতুর পশ্চিম পার্শ্বে পড়ে এবং সম্ভবত জাতীয় সড়কের একদম নিকটে বিধায় ঐ প্রস্তাবিত স্থানটির উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব মাথায় রেখে সেখানে ঐ প্রস্তাবিত নামেই একটি “বঙ্গবন্ধু স্পেস পার্ক” করা যেতে পারে যা জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য, সেমিনার বা বক্তৃতার জন্য, প্লানেটারিয়ামের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।  ফলে আমরা অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ তিনি এই ছেদবিন্দুটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি চমৎকার জনবোধ্যতার জায়গা সৃষ্টি করেছেন।

এবং অবশ্যই একটি অত্যাধুনিক “স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রনমি ইনস্টিটিউট” হিসেবেও জায়গাটি মন্দ নয় (ঢাকার থেকে দূরে, লোকালয় থেকেও কিছুটা দূরে, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার বাইরে নয় – এমন পরিবেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশেষ উপযোগী, কিন্তু পর্যবেক্ষণের জন্য আপনাকে বিশেষ শর্তের কথা মাথায় রাখতে হবে)। তবে মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর অক্ষীয় বিচলনের কারণে পৃথিবীর আনতি কোণের (obliquity) পরিবর্তন ঘটে। ফলে উক্ত  ছেদবিন্দুটি প্রতি শতাব্দীতে ৪৭-সেকেন্ড পরিমাণ দক্ষিণে সরে যায় [৪]। ফলে ১০০ বছর পর এটি দেড় কিলোমিটার সরে যাবে, যা প্রতি বছরে প্রায় ১৫ মিটার সরণের সমান।

মেক্সিকোর একটি মহাসড়কের পাশে কর্কট-ক্রান্তি রেখার বছর-ওয়ারি সরণ খুব সুন্দরভাবে দেখানো আছে। ছবি রবের্টো গঞ্জালেস, উইকি।

শেষ করছি অধ্যাপক ড. সুলতানা নাহারের বাক্য দিয়ে – “এই ছেদবিন্দুটিতে প্রস্তাবিত নামের অধীনে একটি চমৎকার ফ্যাসিলিটি হতে পারে যেখানে মানুষ বেড়াতে আসতে পারে এবং রোদের মধ্যে ছায়াহীন হয়ে ঘোরাঘুরি উপভোগ করতে পারে। এর ফলে মানুষ সূর্য, পৃথিবী এবং মহাজাগতিক স্থানাংক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত স্থানটি মানমন্দিরের মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারণের উপযুক্ত স্থান নয়।”

প্রস্তাবিত স্থানটির

প্রস্তাবিত স্থান

প্রস্তাবিত স্থানটির গুগল কোড:  https://www.google.com/maps/place/23%C2%B030’00.0%22N+90%C2%B000’00.0%22E/@23.5,89.9982547,530m/data=!3m2!1e3!4b1!4m5!3m4!1s0x0:0x0!8m2!3d23.5!4d90

[কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ড. সুলতানা নাহার, এপিএস ফেলো এবং গবেষণা-অধ্যাপক, ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; ড. দীপেন ভট্টাচার্য, জ্যোতির্বিদ, রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; ড. সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন, পোস্ট-ডকটরাল ফেলো, কারনেগি অবজার্ভেটরিজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; সৈয়দা লামমীম আহাদ, পিএইচ-ডি গবেষক, লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস; লিনা কানাস, অফিস অফ অ্যাস্ট্রনমি আউটরিচ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকাল ইউনিয়ন; প্রফেসর পিয়েরো বেনভেনুটি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকাল ইউনিয়ন]

সূত্র:

[১] দেখুন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট – https://most.portal.gov.bd/sites/default/files/files/most.portal.gov.bd/policies/9772d60d_edd5_4747_92a5_c782447c69dc/National%20S%20&%20T%20Policy-2011%20(Action%20Plan).pdf

[২] কয়েকটি পেপার আছে: J. Stock, “Procedures for location of astronomical observatory sites,” IAU Symposium no.19, Paris, p. 35, 1964 (https://ui.adsabs.harvard.edu/abs/1964IAUS…19…35S/abstract); “Guide to Observatory Site Selection” (http://gis.dag-tr.org/uploads/Pubs/2010ShareAstro.pdf); “Astronomical Site Selection for Turkey Using GIS Techniques” (https://arxiv.org/pdf/1504.04549.pdf) .

[৩] ইমেইল কথোপকথন। Professor Piero Benvenuti (https://www.iau.org/administration/membership/individual/4012/), past General Secretary, IAU (2015-2018), and Past President, National Institute for Astrophysics, Italy.

[৪] উইকিপিডিয়া: দেখুন Axial Tilt, Tropic of Cancer  প্রবন্ধ।