বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন‌
#Establishment_of_CUET

বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে কোন দলের বা কোন নেতার কি অবদান ছিল সেটা নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে কিছু আলোচনা দেখলাম। সত্য হলো এই যে, ওই আন্দোলনে তৎকালীন BIT-এর সব ছাত্র-ছাত্রীই কম বেশি সম্পৃক্ত ছিল।

ওই আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিলো তাদেরকে রাষ্ট্র দুরের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ও কখনো বিশেষভাবে মূল্যায়ন করবে না। আন্দোলনে কোন নেতার কি ভূমিকা ছিল সেটা বর্তমান ছাত্রদের কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না, করার কথাও না। আর যেসব শিক্ষক ওই সময়ে পক্ষে-বিপক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন- তাদের কেউ কেউ প্রয়াত, কেউ কেউ অবসরে।

বাকী যারা আছেন তারা ক’বছর পরে যখন সবাই অবসরে চলে যাবেন, তখন এই আন্দোলনের ইতিহাসের কোন মূল্যই আর অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে এটা নিয়ে কামড়াকামড়ি না করাই ভালো। আজ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমি বরং আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস স্মরণ করতে চাই।

২০০০ সালের একটি দিনও ক্যাম্পাসের কোথাও শুনিনি যে, BIT কে বিশ্ববিদ্যালয় করা দরকার। আমাদের চিন্তার জগতে এটা ছিলই না। যদিও আজ অবশ্য অনেকে বলতে পারে যে, অনেক আগে থেকেই তারা স্বপ্ন দেখে আসছিল। স্বপ্ন একজন দেখতেই পারে, তবে সেই স্বপ্নের কথা ২০০০ সালে কোন ছাত্র-ছাত্রী শুনে নাই।

আমি প্রথম শুনেছিলাম ১৪* ফেব্রুয়ারি ২০০১ তারিখে। আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাশ শুরু হয়েছে। বিকালে CSE ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা জানালো- রাতে সাউথ হলের ডাইনিংয়ে ’৯৮ ব্যাচের সবাই মিটিংয়ে বসবে। যথারীতি মিটিংয়ে গেলাম।

জানলাম সকালে Saki Kowsar স্যার ছাত্রদেরকে বলেছেন, “BIT কে বিশ্ববিদ্যালয় করা দরকার। তোমরা সবাই মিলে আলাপ আলোচনা করে দেখো কি করা যায়”।

মিটিং করলাম। বক্তৃতা দিলাম। ’৯৮ ব্যাচ সিদ্ধান্ত নিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় করা দরকার। প্রয়োজনে এর জন্য আন্দোলন করবো।

আমরা প্রথমে ’৯৮ ব্যাচের বন্ধুদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। শুরুতে অনেকেই এটাকে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর বলে মনে করতো। কিন্তু আমরা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হিসাবে আসে ’৯৯ ব্যাচ।

ওরা প্রথম দিন থেকেই বিনা প্রতিবাদে আমাদের সাথে মাঠে নামে। ওরা বরং আমাদের চেয়ে বেশি উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করে। এর ক’দিন পরেই এলো ২০০০ ব্যাচ। এরা আরো এক কাঠি সরেস। আমরা তখন ৩ ব্যাচ মিলে ৭২০ জন ছাত্রছাত্রী, অর্থাৎ BIT তে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

আমরা ব্যানার ফেস্টুন তৈরি করতাম। প্রতিদিন মিটিং মিছিল করতাম। সিনিয়র জুনিয়র সবার রুমে রুমে যেয়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা বোঝাতাম। এক সময় আমাদের আন্দোলনে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত হয়- ৯৫, ৯৬ ও ৯৭ ব্যাচ।

এভাবে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ* গেলো। এপ্রিলে** যখন আন্দোলন কিছুটা বেগবান হলো, তখন ছাত্রলীগ এর নেতৃত্বে আসে। ছাত্র ইউনিয়নও এতে যোগ দেয়। তখন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির বলে প্রকাশ্যে কিছু ছিল না।

ছাত্রলীগ নেতৃত্বে আসার ফলে এই আন্দোলন খুব দ্রুতই ব্যাপক আকার ধারন করে। আমরা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে গিয়েছি এবং আমাদের দাবীর স্বপক্ষে তাদের সমর্থন আদায় করেছি।

আমি যতদুর শুনেছি ওই সময়ে শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমাদের এই আন্দোলনের ব্যাপারে অবগত করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখেননি। তিনি বলেছিলেন, “ IIT গুলো তো ভার্সিটি হবার জন্য দাবী করছে না।

তাহলে BIT গুলোর ভার্সিটি করার দাবী কেন? এগুলো তো ভার্সিটির থেকে কোন অংশে কম না। ওদের যদি কোন সমস্যা থাকে তাহলে আমি সেগুলো সমাধান করে দিচ্ছি”। এভাবে তিনি ৪ BIT’র জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ করেন। কিন্তু ভার্সিটি করার দাবী নাকচ করে দেন।

এরই মধ্যে ১৫ জুলাই ২০০১ তারিখে আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করে এবং বিচারপতি লতিফুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেন।

তত্ত্বাবধায়কের সময় ছাত্রলীগ একটু ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা সাধারণ ছাত্ররা দৌড়ঝাপ অব্যাহত রাখি। এই সময়ে BNP তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষনা করে যে, তারা ক্ষমতায় এলে ৪টি BIT কে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে।

০১ অক্টোবর ২০০১ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আর ১০ অক্টোবর তারিখে BNP সরকার গঠন করে। ওই দিনেই ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের মিছিল বের হয়। আর ছাত্রলীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বাদে বাদবাকী নেতাকর্মীরা রাতারাতি দল পাল্টে ছাত্রদলে যোগ দিয়ে মিছিলের অগ্রভাগে অবস্থান নেয়।

এরপরেও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন চলেছিল প্রায় ২ বছর। এই দুই বছরে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দেয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটা সম্ভবও না। তারা প্রতিটা দিন সংগ্রাম করেছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে ছাত্রলীগের প্রতিটা নেতা কর্মীই এই আন্দোলন সংযুক্ত থেকেছে, যার যার মতো করে ভূমিকা রেখেছে।

যদিও এই সময়ে সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনের সামনে চলে আসে ছাত্রদল। ছাত্রশিবিরও আন্দোলনে যোগ দেয়। কেউ বাদ যায়নি। দেশের মূল ধারার রাজনীতি ওই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দেয়নি।

২০০২ সাল। ততোদিনে চট্টগ্রাম BIT কে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবীর প্রতি সমর্থন ধ্বনিত হতে থাকে সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের মুখ থেকে। সারাটা বছরই আমরা আন্দোলন করেছি। ২০০৩ এ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আসেন BIT এর দ্বিতীয় কনভোকেশনে।

আমরা আশা করলেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তেরের কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেন নি। তবে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, এটা করা হবে। অন্যান্য BITগুলো দেখলো চট্টগ্রাম BIT তো বিশ্ববিদ্যালয় হয়েই গেলো ! তাই তাও আন্দোলন শুরু করলো। তাদের আন্দোলন আমাদের আন্দোলনে ফুয়েল সরবরাহ শুরু করলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের একটা বড় অংশ এই আন্দোলনে বিরোধীতা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় হলে অনেক নতুন নুতন শিক্ষক আসবে আর তাদের পাঁকা ধানে মই দিবে- এই ভয়ে।

বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষকেরা তদ্বির করেছিলেন যেন এটাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর অবধারিত জেনে বুয়েটও অনেক চেষ্টা করেছিল যেন এটাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয় আর সিন্ডিকেটের বদলে যেন রিজেন্ট বোর্ড গঠন করা হয়।

মাঝখানে ছাত্রদল দাবী তুলেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে- জিয়া প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ( ZUET)। তাদের এই দাবীতে সাধারণ ছাত্ররা স্বভাবতই খুব ক্ষুব্ধ ছিল।

২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (সফি-আজম পরিষদ) অভিষেক অনুষ্ঠান প্রধান অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী।

তাকে সন্তুষ্ট করতে দাবী তোলা হয়- নতুন ছাত্র হলের ( বর্তমানে বঙ্গবন্ধু হল) নাম হবে ফজলুল কাদের চৌধুরী হল। দাবী শুনে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলেন, “আমার বাপের নামে হলের দরকার নাই। এসব বলে আমারে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করার দরকার নাই। ভার্সিটি এমনিতেই হবে”।

আমাদের দাবী অবশেষে ২০০৩ সালের এপ্রিলের*** দিকে মন্ত্রীপরিষদে প্রস্তাব আকারে উঠে। মূলত ওইদিনটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। কারন সরকার অফিসিয়ালি সিদ্ধান্ত নিলো। এরপর থেকে আন্দোলন যেটা ছিল সেটা আসলে নামকাওয়াস্তে। কারন আন্দোলনের কিছু ছিল না।

আমরা জানতাম বাজেট অধিবেশনের শেষের দিকে কোন এক সময় এটা সংসদে উঠবে। অবশেষে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে সংসদে আরো ৩ টি বিশ্ববিদ্যালয় বিলের সাথে ‘চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৩” পাশ হয়।

নামটা হবার কথা ছিল- চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু বুয়েটের জোর তদ্বিরে নাম হয়ে গেল- চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়!

আজ এই দিনে আমি কোন বিশেষ ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করতে চাই না। তবে ৪ জনের কথা না বললেই নয়।

২০০১ সালের আগস্টে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ভবনের সামনে আজিজ মিসির সেলিম ভাই ( তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি) ভাষনের এক পর্যায়ে বলে বসলেন, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে যদি BIT কে ভার্সিটি করা না হয়, তাহলে আমরা চিটাগাংকে বাংলাদেশ থেকে সেপারেট করে ফেলবো। আমি জানি উনি মিন করেছিলেন যে, সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হবে।

কিন্তু উনার কথার যে অর্থ দাড়ালো তাতে আমরা বন্ধুরা নিজেরা নিজেরা সেলিম ভাইকে নিয়ে মজা করে বলতাম, ভবিষ্যতে যদি কোন দিন চট্টগ্রাম স্বাধীনতা লাভ করে, তবে সেলিম ভাই হবে স্বাধীন চট্টগ্রামের স্বাধীনতার ঘোষক !!

আমার ঠিক মনে নেই কবে আল আমীন ভাইকে আহবায়ক করে কমিটি গঠিত হয়েছিল। আল আমীন ভাই ছিলেন ক্যাম্পাসের সবচেয়ে প্রিয় মুখগুলোর একটি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়কের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য উনার দুটো যোগ্যতা ছিল।
১) উনি ওই সময়ে সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচের সেরা ছাত্র ছিলেন
২) উনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন। বাস্তবতা হলো, উনি নেতৃত্ব অর্জন করেন নাই। উনাকে নেতা বানানো হয়েছিল। কারণ যে কোন আন্দোলেন ভালো ছাত্রদেরকে ঢাল হিসাবে সামনে দাড় করিয়ে দেয়ার একটা ট্রেন্ড BIT তে ছিল।

তবে আমাদের সৌভাগ্য এই যে, আল আমীন ভাই প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি না করলেও, তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে একজন প্রকৃত নেতা হয়ে উঠেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো ছাত্রদেরকে জোর করে নেতা বানিয়ে দিলে ফল ভালো হয় না। কিন্তু আল আমীন ভাই এক্ষেত্রে তার দায়িত্ব অসাধারণভাবে পালন করেছেন।

আরেকজনের কথা বলবো। সফিউল আজম। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি ও ছাত্রদলের সভাপতি। আল আমীন ভাই পাস করে চলে যাবার পরে সফি ভাই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান।

আর সবার নেপথ্যে থেকে যে মানুষটা কাজ করেছেন। যাকে আমি বলি দেশের ৪ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনক- তিনি হলেন চুয়েটের সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে বঞ্চিত, সদা সর্বদা ষড়যন্ত্রের গান পয়েন্টে থাকা মানুষ- সাকী কাওসার ( Saki Kowsar ) স্যার।

আমরা প্রায় আড়াই বছর আন্দোলন করেছিলাম। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল ৬ মাস ( ফেব্রুয়ারি -জুলাই ২০০১), তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৩ মাস ( জুলাই- অক্টোবর ২০০১) আর বিএনপি প্রায় ২ বছর ( অক্টোবর ২০০১- সেপ্টেম্বর ২০০৩)। শুধু এই মেয়াদকাল বিশ্লেষন করলেই অনেক কিছু ধারনা করা সম্ভব।

BIT বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ঠিকই। একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে ১৭ বছরে যে উন্নয়ন দেখা যায়, সেটা ৫১ বছরের চুয়েটে দেখা যায় না। চুয়েটের পরে একেবারে শূন্যস্থানে নতুন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাদের মধ্যেও কেউ কেউ অনেক এগিয়ে গিয়েছে।

যাক সে সব কথা। আজ জন্মদিন। শুভ কামনা জানাই। অভিনন্দন জানাই। আন্দোলনের আড়াই বছরে যারা BIT তে ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানাই। শুভ জন্মদিন চুয়েট।

পারভেজ মাসুদ
২৯ তম ব্যাচ ( ‘৯৮ সিরিজ)
তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগ

Loading