এক চিমটি বিজ্ঞান, এক চিমটি মানবিক ও এক চিমটি ব্যবসা বিষয়ের স্যালাইন শিক্ষা দিয়ে কেবল বনসাই প্রজন্ম তৈরি হতে পারে। উন্নত দেশ তৈরীর জন্য যেই সোনার মানুষ দরকার সেইটা হবে না।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সংসদে জানিয়েছেন, মাধ্যমিকের নতুন পাঠ্যক্রমে কোনো বিভাগ থাকবে না। অর্থাৎ বাংলা মাধ্যমের সব ছাত্রছাত্রী দশম শ্রেণি পর্যন্ত একই বিষয় পড়বে। শুনতে বেশ ভালো শোনায়। যারা এই পাঠ্যক্রম প্রণয়নে কাজ করছেন তারা নাকি অনেক উন্নত দেশের পাঠ্যক্রম দেখে এটি প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন।

উন্নত দেশে বিভাগ নেই বটে, তবে একজন শিক্ষার্থী যে যে বিষয় পড়তে চায় সেই বিষয় নির্বাচনে প্রচুর বিকল্প থাকে। মাধ্যমিকের বর্তমান ব্যবস্থাতেও অন্তত তিনটি বিকল্প আছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় সামান্য এইটুকু বিকল্পও থাকবে না।

পৃথিবীর যেসব দেশে এসএসসি লেভেলে বিভাগ থাকে না, সেসব দেশে প্রচুর বিকল্প সাবজেক্ট থাকে। সেখানে সবাইকে একই সাবজেক্ট পড়তে বাধ্য করা হয় না। যে যেমন চায় সে সেই রকম কম্বিনেশনে বিষয় নির্বাচন করতে পারে।

ইংল্যান্ডের ইংরেজি মাধ্যমের সাবজেক্টের সংখ্যা দেখলে যে কারুর চোখ কপালে উঠবে। সেখানে যে বিজ্ঞান পড়তে চায় সে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, ঐচ্ছিক-গণিত সব নিতে পারে। ইচ্ছে করলে ব্যবসা অথবা কলা বিষয়ের কোনো কোনো বিষয়ও নিতে পারে। একজন ছাত্র বা ছাত্রী মোট কয়টা বিষয় নির্বাচন করতে পারবে সেখানেও রয়েছে নমনীয়তা।

কারও ইচ্ছে করলে স্পোর্টস, নাট্যকলা, সংগীত ইত্যাদিও নিতে পারে। যারা এসব নিয়ে দোদুল্যমানতায় থাকে তারা ইচ্ছে করলে সবকিছুরই কম্বিনেশন নিতে পারে। ইচ্ছে করলে ন্যূনতম সাবজেক্টের বেশি বিষয়ও নিতে পারবে। এটাকেই বলে ফ্রিডম। এই ফ্রিডম থাকলে বৈচিত্র্য আসে। পৃথিবীর কোথাও এ রকম ঘাড়ে ধরে সবাইকে একই বিষয় পড়তে বাধ্য করা হয় না।

এমনি এমনি কি দেশে ইংরেজি মাধ্যম জনপ্রিয় হচ্ছে? যারা এখন বাংলা মাধ্যমের কারিকুলাম থেকে বিভাগ উঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে, খোঁজ নিয়ে দেখুন তাদের অধিকাংশের ছেলেমেয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে অথবা তাদের সন্তানদের স্কুলের গণ্ডি ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে।

সুতরাং এই পরিবর্তনের ফলে তারা বা তাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। নতুন এই পদ্ধতি চালু করলে শিক্ষার মান যতটুকু অবশিষ্ট আছে সেটার ধ্বংসও অনিবার্য।

অনেক ছেলেমেয়ে আছে যাদের ছোটবেলা থেকেই কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি বিশেষ ঝোঁক থাকে এবং সেই বিষয়ে সে অন্য সমবয়সীদের একটু বেশি এগিয়ে থাকে। তারা তাদের পছন্দের বিষয় পড়ে যতটা আনন্দ পায়, অপছন্দের বিষয় পড়তে ততটাই বিরক্তি দেখায়।

এজন্যই বাবা-মা ও স্কুলের শিক্ষকদের দায়িত্ব কার কোনদিকে ঝোঁক সেটা খেয়াল করা। এই স্পেশাল ছাত্রছাত্রীদের এক্সট্রা কেয়ার নিতে হয়। সে রকম কেউ যদি বিজ্ঞান ও গণিতে খুব ভালো হয় আর তাকে যদি বিজ্ঞানবিষয়ক বিষয় বর্তমানের তিন ভাগের একভাগ পড়ানো হয়; আর জোর করে তার অপছন্দের কিছু বিষয় পড়তে বাধ্য করা হয়, তাহলে কি তার মেধার পূর্ণ ব্যবহার হবে?

অন্যদিকে কেউ যদি শিল্প, সাহিত্য, ভূগোল, নাট্যকলা, সংগীত ইত্যাদিতে ভালো হয় এবং গণিত ও বিজ্ঞানে দুর্বল হয়, তাকে কেন গণিত ও বিজ্ঞান পড়তে বাধ্য করা হবে? সবাই একই বিষয় নিয়ে একই বই পড়বে এটা শুনতে ভালো শোনালেও এর ফলে আমরা ‘গড়পড়তা শিক্ষার্থী’ তৈরি করব।

অর্থাৎ যার বড় বিজ্ঞানী হওয়ার কথা বা যার বড় চিত্রশিল্পী হওয়ার কথা তাকে একটি ছাঁচে ফেলে দিয়ে ‘গড়পড়তা শিক্ষার্থী’ এবং ‘গড়পড়তা মানুষ’ হিসেবে তৈরি করে দেশ খুব বেশি আগাতে পারবে না।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানলাম যে, দশম শ্রেণিতে কেবল ১০টি বিষয় থাকবে এবং সবাইকে ১০টি বিষয়ই পড়তে হবে। এই দশটি বিষয় হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্মশিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

অর্থাৎ বর্তমানের সাধারণ গণিত ও ইলেকটিভ গণিতের পরিবর্তে কেবল সাধারণ গণিত পড়ানো হবে। বর্তমানের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান নামক তিনটি আলাদা বিষয়কে এক করে বিজ্ঞান নামক একটি বিষয় বানানো হবে।

তার মানে যারা সত্যি সত্যি ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়বে তারা বর্তমানের চেয়ে অনেক কম গণিত পড়বে এবং পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানের চেয়ে তিন ভাগের দুভাগ কম পড়বে। এর ভবিষ্যৎ ফলাফল তো দূরের বিষয়, এতটা কম পড়ে তারা উচ্চমাধ্যমিকের বর্তমান সিলেবাসই ফলো করতে পারবে না।

শুধুই কি তাই। আগে কলা বা মানবিক বিভাগে পড়ে যতগুলো বিষয় পড়ত সেগুলোকেও একইভাবে কমিয়ে ছোট আকারে পড়ানো হবে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের এক চিমটি বিজ্ঞান, এক চিমটি মানবিক ও এক চিমটি ব্যবসা বিষয়ের স্যালাইন বানিয়ে বনসাই প্রজন্ম বানাব।

অর্থনীতিতে পারেতোর নামানুসারে একটি সূত্র আছে, যেখানে বলা হয়েছে প্রায় যেকোনো ক্ষেত্রে ৮০% ফলাফলের জন্য ২০% কারণ দায়ী।

সাধারণভাবে ফলাফল ও কারণের সম্পর্ককে causality বলে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে কাজের সংজ্ঞানুসারে ‘সরণ’ হলো ‘ফল’ আর ‘বল’ হলো ‘কারণ’; যেহেতু বলের কারণেই বস্তুর সরণ হয়। পারেতোর সূত্র মতে দেখা গেছে, একটি দেশের ৮০% এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করে ২০% বিনিয়োগকারী, যেকোনো অফিসের ৮০% কাজ করে ২০% এমপ্লয়ি, ৮০% জ্ঞান সৃষ্টি করে ২০% গবেষক, ৮০% ফসল হয় ২০% জমিতে এবং ৮০% ইমপ্যাক্ট ফুল আবিষ্কার করে ২০% বিজ্ঞানী।

এর মাধ্যমে আমরা কী বুঝলাম? একটি দেশকে উন্নত করতে হলে ওই ২০% উন্নত মানুষকে টার্গেট করে যত উন্নত করে গড়ে তোলা যায় দেশ ততই উন্নত হবে। এই ২০% মানুষকে খুঁজে তাদের পোটেনশিয়ালকে কাজে লাগানোর চেষ্টাই হবে দেশ উন্নয়নের চাবিকাঠি। এই সূত্র মতে অধিকাংশ মানুষই আসলে তলিয়ে চিন্তা করতে অক্ষম।

বিভাগ উঠিয়ে দিলে এই ২০% মানুষের মান বৃদ্ধি প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। নতুন শিক্ষায় বড় বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার হবে না। এর আরেকটা দিক আছে, সেটা হলো ‘গড় মানুষের’ সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু গড় মানের মানুষ দিয়ে উন্নত দেশ গড়া যাবে না।

কেবল বিভাগ উঠিয়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষতি যেন যথেষ্ট না! ক্ষতির মাত্রার ষোলোকলা পূর্ণ করার জন্য বর্তমানে মূল্যায়নের যে পদ্ধতি চালু আছে সেখানেও পরিবর্তন এনে একদম ষোলোকলা পূর্ণ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

মোট দশটি বিষয়কে প্রথমে দুই ভাগে ভাগ করা হচ্ছে। ‘এলিট’ শ্রেণিতে থাকছে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান আর সামাজিক বিজ্ঞান। অন্যদিকে ‘নন-এলিট’ শ্রেণিতে থাকছে জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্মশিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এলিট শ্রেণির পাঁচটি বিষয়ে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৫০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়নের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

আর বাকি নন-এলিট পাঁচটি বিষয়ে কোনো লিখিত পরীক্ষা থাকছে না বরং পুরোটাই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে যেসব বিষয়ে লিখিত মূল্যায়ন রাখা হয়নি ছাত্রছাত্রীরা কি সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পড়বে?

বাংলাদেশের একটি উপজেলা স্কুলের কথা ভাবুন। সাধারণভাবে বলা চলে ওইসব স্কুলের শিক্ষকরা রাজনীতি, প্রাইভেট ও কোচিংয়ে পড়ানোতে কোনো না কোনো মাত্রায় ব্যস্ত থাকেন। এই শিক্ষকের ঘাড়ে কি দুটি মাথা আছে যে এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সরকারি দলের নেতাদের সন্তানদের ধারাবাহিক মূল্যায়নে পূর্ণ নম্বর থেকে ১ নম্বরও কম দেবে?

শিক্ষকদের কাছে যারা প্রাইভেট পড়বে বা যারা শিক্ষকদের কোচিং সেন্টারে পড়বে তারা ধারাবাহিক মূল্যায়নে কেমন করবে এটা বুঝতেও কি কারুর গবেষণা করার দরকার আছে?

আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা কি নানা রকম প্রভাব ও প্রতিপত্তির ঊর্ধ্বে ওঠে বা অবজ্ঞা করে সঠিকভাবে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করতে পারবেন? আমরা কি সে রকম ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে পেরেছি? আমরা কি শিক্ষকদের মধ্যে যেন আত্মসম্মানবোধ জন্মায় সে রকম সম্মানজনক বেতন দিতে পেরেছি?

দিই না বলেই শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়ান, কোচিং সেন্টারে অতিরিক্ত ক্লাস নেন। আমাদের স্কুলের বর্তমানে ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর কীভাবে দেওয়া হয় সেটি একটু পর্যালোচনা করলেই পুরো বিষয়টা আরও খোলাসা হয়ে যাবে। স্কুলের ব্যবহারিক পরীক্ষায় সব ছাত্রই প্রায় ২৫-এর মধ্যে ২২ থেকে ২৪ পায়। এই ক্ষেত্রে টাকার লেনদেন থেকে শুরু করে ক্ষমতার চোখ রাঙানি পর্যন্ত হয়।

আমরা তো দেখি সরকারি দলের নেতারা, এমনকি ছাত্রনেতারা পর্যন্ত কীভাবে শিক্ষকদের নাজেহাল করে? পরীক্ষা হলে নকল করতে না দেওয়ার জন্য মারধর পর্যন্ত করে।

এবার ধারাবাহিক মূল্যায়ন তাদের হাতে দিলে শিক্ষকদের ওপর অত্যাচার আরও বেড়ে যাবে বলে আমি আশঙ্কা করি। আমরা জানি স্কুলে পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনের কমিটি বিস্তৃত হয়েছে। এসব কারণে শিক্ষকরা এমনিতেই vulnerable বা দুর্বল।

বাংলা-মাধ্যম নিয়ে আমাদের সরকাররা কেন এত খেলা খেলে? বড়লোকের ছেলেমেয়েরা যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে তারা বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধকে জানল কি না ওইটা নিয়ে তাদের কিন্তু মাথাব্যথা তেমন নেই। ওরা বাংলা ভাষা শিখল কি না অথবা দেশের সংস্কৃতি জানল কি না সেটা নিয়েও তাদের মাথাব্যথা নেই।

ওরাও কিন্তু বাঙালি ও বাংলাদেশি। তাদের কেন আমরা এক্সপোর্ট কোয়ালিটি হিসেবে গড়ে তুলছি? তাদের নিয়ে কেন আমরা ভাবছি না? অথচ এই শ্রেণিটাই হলো রুলিং ক্লাস। তারা হয় ইউরোপ-আমেরিকায় চলে যাবে, নয়তো বাপের ইন্ডাস্ট্রির সিইও হবে নয়তো এমপি-মন্ত্রী হবে।

সরকারের যত মাথাব্যথা গরিবের বাংলা মাধ্যম ও মাদ্রাসা নিয়ে। ‘গরিবের বৌ সকলের ভাবী’ হওয়ার মতো অবস্থা।

এত কিছু কেন করতে হয়? আমাদের একটা সহজ সমাধান থাকতে আমরা কেন নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে যাই? আমাদের দেশে তো ইংরেজি মাধ্যম আছে এবং এটি সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। আমি নিজে ইংরেজি মাধ্যমের সিলেবাস খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি।

ইংরেজি মাধ্যমের বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করে ইংরেজি মাধ্যমের বাংলা ভার্সন করলেই বেটার সমাধান হতো বলে আমি মনে করি। এদের বইগুলো এত চমৎকার যে তা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না।

দয়া করে মাধ্যমিকে বিভাগ উঠিয়ে দিয়ে প্রস্তাবিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা থেকে বিরত থাকুন। এমনিতেই লেখাপড়ার মান নিম্নগামী। এমনিতেই জিপিএ চালু করে ফলাফলের ইনফ্লেশন ঘটিয়ে শিক্ষার মান কমিয়েছি।

এমনিতেই সৃজনশীলতার নামে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। আবার বিভাগ উঠিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় সবাইকে পড়ালে বাংলা মাধ্যম শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেকটা সফলতার সঙ্গে ঠুকে দেওয়া হবে।

লেখকঃ কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

khassan@du.ac.bd