বুয়েটে এর আসন সংখ্যা ৩০।

“এটাতো শেষের দিকের সাবজেক্ট”,
“ ইউআরপিতে পড়ি, মানুষ শুনলে কি বলবে?”
বা, “দেখি, আর কোথাও চান্স না হলে শেষে এই সাবজেক্টে পড়বো”

এই কথাগুলো যদি তোমার আশেপাশে ভেসে বেড়ায়, তাহলে তুমি এখনও ভুলের মধ্যে আছ। বুয়েটে চান্স পাওয়ার আগে আমরা এসব কথা বলে থাকলেও বা ভেবে থাকলেও, বুয়েটে একবার এসে গেলেই তুমি বুঝবে তোমার ধারণা কতটা অমূলক ছিল। এখানে প্রতিটা বিভাগ স্বতন্ত্র।

প্রতিটা বিভাগের পড়াশোনা, ল্যাব, কারিকুলাম, জবের ক্ষেত্র সবকিছুতেই পার্থক্য আছে। তোমার ইচ্ছা, যোগ্যতা মিলে গেলে তুমি এই বিভাগ থেকে এতটা shine করতে পারবে, দেশকে এতটা দিতে পারবে যেটা হয়তো কথিত “উপরের দিকের” সাবজেক্ট পড়ে পারতে না। কিন্তু এই ইচ্ছাটা তৈরীর জন্য আগে তো জানতে হবে বিষয়টা নিয়ে, তাইনা? সেজন্যই আজকের এই রিভিউ।

ইউ আর পি জিনিসটা কী ?

আমাদের এই সভ্যতা তৈরীতে অনেকের অনেক রকম ভূমিকা আছে। এই যেমন ধরো আর্কিটেক্ট, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, রাজমিস্ত্রি আরও অনেক পেশা। এর মাঝে প্ল্যানারদের কাজটা কি ? আর্কিটেক্ট একটা বাসার, রাস্তার, ব্রীজের, পার্কের ডিজাইন করবে। আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সেটা বাস্তবে রূপদান করবে। আর প্ল্যানার নির্ধারণ করবে কোনটা করা উচিত, কোনটা উচিত না, উচিত হলে কোথায় করা উচিত, কতটুকু করা উচিত ইত্যাদি।

যেমন ধরো, বসুন্ধরা সিটি; এটার ডিজাইন করেছে আর্কিটেক্ট, বানিয়েছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু এটা বানানোতে সামনের রাস্তার উপরে গাড়িঘোড়া বেড়ে যাবে, বেড়ে গেলে সেই লোড নিতে ব্যবস্থা নিতে হবে এগুলো মাথায় রাখা প্ল্যানারের কাজ। খুব কাছাকাছি একটা উদাহরণঃ মগবাজার ফ্লাইওভার। এই ফ্লাইওভার বানালে কি লাভ হবে, কারা উপকৃত হবে, কারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, কি কি ক্ষতি হবে, পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে কিনা, বানাতে যে বিপুল ব্যয় হবে সেটা আদৌ উঠে আসবে কিনা, মানুষের আয় রোজগার বাড়বে কিনা, যানজট আদৌ কমবে কিনা, নাকি ফ্লাইওভারের উপরে জ্যাম তৈরী হবে এগুলো ভাবা প্ল্যানারের কাজ।

আবার ধর, তোমাকে একটা ফাকা জায়গা দিলাম, বললাম এখানে ৫০০০ মানুষ থাকবে যারা গার্মেন্টসে কাজ করে। তাদের জন্য একটা “ছোট শহর” বানিয়ে দাও। এখন তোমাকে সর্বপ্রথমে ডাকতে হবে প্ল্যানারকে। তিনি তোমাকে জানাবেন কতটা জায়গা জুড়ে বিল্ডিং উঠবে, কতটা জায়গা ফাকা থাকতে হবে, কয়টা মসজিদ, স্কুল ইত্যাদি দরকার, কেমন বাড়ি করলে গার্মেন্টসের লোকজন ভাড়া দিয়ে পোষাতে পারবে অন্যদিকে সরকারেরও ক্ষতি হবেনা ইত্যাদি। এগুলো ঠিক হলে তারপরে আর্কিটেক্ট আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ। কিন্তু এগুলো যদি ঠিক না হয়, তাহলেই হবে সমস্যাগুলো।

এগুলোতে অবহেলা করে সবকিছুতে আর্কিটেক্ট ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের উপর নির্ভর করায় আজকে ঢাকায় এত যানজট, ফ্লাইওভার দিয়েও লাভ হচ্ছেনা, সবগুলো খাল দখল হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো না, বুড়িগঙ্গা মরে গেছে, বিভিন্ন বিল্ডিং এ সময়ে সময়ে আগুন লাগে, পুরান ঢাকায় ভূমিকম্পে বিল্ডিং ধ্বসে পড়ে, শহরে সবুজ গাছ কমে গেছে, বাচ্চাদের খেলার জায়গা নেই, ঢাকার তাপমাত্রা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে, ধূলাবালি বেড়ে গেছে, মানুষের চাপ বেড়ে গেছে। বলতে নিলে বলে শেষ হবেনা।

মোদ্দাকথা, নগরের সার্বিক পরিকল্পনার কাজটা করে এই বিভাগের প্ল্যানাররা। প্ল্যানার মানে সব: একজন ডিজাইনার, একজন উন্নয়নবিদ, একজন অর্থনীতিবিদ, একজন পরিবেশবিদ, একজন সড়ক পরিকল্পনাবিদ, একজন বিশ্লেষক। যা কিনা, একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাজের চাইতে অনেক ব্যাপক।

কাজের ক্ষেত্রঃ

বুঝতেই পারছো এই সেক্টরের কাজের ক্ষেত্র ব্যাপক ও Exciting। ইউআরপি তে পড়ে তুমি যেসব বিষয়ে পারদর্শী হতে পারঃ
Transport Planning
Environmental Planning
Land Use Planning
Geographic Information System (GIS)
Remote Sensing
Surveying (Physical and Social)
Urban Planning
Regional Planning
Disaster planning
Project management
Historic Conservation Planning
Economic Planning

কী কী পড়তে হবে এই চার বছরে?

এই বিভাগের কাজের বিস্তৃতি অনেক দিকে হওয়ায় ইউআরপি’র কারিকুলামে multi-dimensional সাবজেক্ট পড়ানো হয় যাতে করে এখান থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তোমার সামনে অনেক অপশন খোলা থাকে হায়ার স্টাডিজের জন্য। এখানে বেশ কিছু নন ডিপার্টমেন্টাল সাবজেক্টের কোর্স করানো হয়।

যার মধ্যে Architecture এর গ্রাফিক, বেসিক ডিজাইন, Civil Engineering এর সলিড মেকানিক্স, Water Resource Engineering, Chemistry, Math, Programming, Economics এর বেশ কিছু কোর্স উল্লেখযোগ্য। আর ডিপার্টমেন্টাল সাবজেক্টের মধ্যে urban planning, regional planning, transport planning, site and area planning, GIS, Remote sensing, project management, rural planning, participatory planning ইত্যাদি পড়ানো হয়।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি তুমি শিখতে পারবে যেটা অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে তেমন শিখতে পারবে না, সেটা হল প্রেজেন্টেশন। তোমার মধ্যে যেকোন কিছুকে সুন্দর করে প্রেজেন্ট করার একটা সহজাত ক্ষমতা তৈরী হবে, যা তোমাকে চাকুরীর ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা এনে দিবে।

কোথায় চাকরী করবো?

* University Teacher (এখানে সিট সংখ্যা কম, চাইলে একটা চান্স নিয়ে নিতে পার😉)
* City Development Authority (রাজউক, KDA, CDA, বিভিন্ন পৌরসভা ইত্যাদি)
* Govt. Job (এলজিইডি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, RDRS, প্ল্যানিং কমিশন, DTCA ইত্যাদি)
* রিয়েল এস্টেট (আমিন মোহাম্মাদ গ্রুপ, ডোমইনো, ইসিএল ইত্যাদি)
* কনসালটেন্সি ফার্ম, ডিজাইন ফার্ম (শেলটেক, ডিডিসি ইত্যাদি)
* বিভিন্ন প্রজেক্ট ম্যানেজিং (বিআরটি প্রজেক্ট, খাল উন্নয়ন প্রজেক্ট, দূর্যোগ প্রতিরোধ প্রজেক্ট ইত্যাদি)
* দেশি বিদেশি পরিবেশবাদী সংগঠন
* দেশি এনজিও (Wbb Trust, পবা ইত্যাদি)
* ইন্টারন্যাশনাল এনজিও (USAID, UNFPA, UNDP, Save the Children ইত্যাদি)

এছাড়া বিসিএস, ব্যাংকিংসহ যেকোন কর্পোরেট ফার্মে চাকরীর সুযোগ তো আছে ই।

শেষকথাঃ

কোনো ডিপার্টমেন্ট এমনি এমনি খোলা হয়না। প্রতিটার গুরুত্বই আলাদা আলাদা। বাইরে থেকে যেমন মনে হয় এই বিভাগকে, ভেতর থেকে কখনই তেমনটা না। বিদেশ এতটা সুন্দর প্ল্যানারদের গুরুত্ব দেয়ার কারণে।

বাংলাদেশে দেরীতে হলেও ট্রেন্ড শুরু হচ্ছে। এখানে অনেক কিছু আছে এক্সপ্লোর করার, ইনোভেট করার, দেশকে কিছু দেয়ার। তাই যারা চিন্তায় আছো এই বিভাগ নিয়ে, তোমরা চিন্তা ছেড়ে ভর্তি হতে পারো। তোমার হাতেই গড়ুক আগামীর নগর!

আরো জানতে পড়ুন নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (URP)

নগর পরিকল্পনা – আমার লজ্জা, আমার অহংকার!