কামরুল হাসান মামুনঃ সায়েন্স নিউজ নামের একটি গণমাধ্যমের বিচারে বাছাই করা ১০ বিজ্ঞানীর একজন হয়েছেন বাংলাদেশি তরুণী তনিমা তাসনিম অনন্যা। কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি এই স্বীকৃতি পেয়েছেন।

সায়েন্স নিউজের ওয়েবসাইটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তনিমা বর্তমানে ডার্টমাউথ কলেজের সঙ্গে তিনি যুক্ত আছেন। ২০১৯ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তনিমা।

মানারত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন তনিমা

প্রশ্ন হলো তনিমাকে আজকের তনিমা হয়ে উঠার পেছনে কোন প্রতিষ্ঠানের অবদান সবচেয়ে বেশি? স্কুল কলেজ বাংলাদেশে। তারপর? তারপর ইয়েল, নাসা, ডার্টমাউথ প্রভৃতি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান তাকে আজকের তনিমা বানিয়েছে।

প্রশ্ন হলো? সে যদি বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো তাহলে কি সে পারতো? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো প্রতিভা ধ্বংসের প্রতিষ্ঠান।

আমার স্বল্প জীবনেই দেখেছি কতজনকে ইউরোপ আমেরিকা প্রতিভাবান বানিয়েছিল কিন্তু দেশের টানে বাংলাদেশে এসে সেই প্রতিভার প্রতিভা আর কাজে লাগাতে পারেনি।

প্রচন্ড পোটেনশিয়াল মানুষগুলো দেশে এসে তাদের পোটেনশিয়ালকে খুন করা হয়েছে। দেশ তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারেনি।

কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় khassan@du.ac.bd

কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় khassan@du.ac.bd

গত ৪৯ বছরেও এমন একটি প্রতিষ্ঠানও তৈরী করতে পারিনি যেই প্রতিষ্ঠান প্রতিভা তৈরী এবং লালন করবে। অল্প স্বল্প যতটুকুই ভালো ছিল সেগুলোকেও ক্ষমতার রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়ে নষ্ট করে ফেলছে।

আজকে তনিমার সাফল্য দেখে মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে যেন তাকে আমরাই বানিয়েছি। যারা তাকে বানিয়েছে তারা কিন্তু এত উচ্ছাস প্রকাশ করছে না।

আমাদের মিডিয়া এই নিউজটাকে ব্যবহার করে একটি এনালিটিক্যাল রিপোর্ট করতে পারতো। গতানুগতিক উচ্ছাস! তারা বলতে পারতো কেন গত ৪৯ বছরেও একটি বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরী করতে পারিনি?

গার্মেন্টসের বড় বড় পদে বিপুল বেতনে বিদেশী নিয়োগ দিতে পারলে কেন আমরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী নিয়োগ দিয়ে দেশের মধ্যেই বিদেশী মানের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছি না?

অথচ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশি বিদেশী উচ্চ মানের শিক্ষক গবেষক নিয়োগ দিলে দেশেই উচ্চ মানের শিক্ষিত মানুষ তৈরী করতে পারতাম। এতে আমাদের বেকার সমস্যা দূর হতো। বিদেশী নিয়োগ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যেতে হতো না।

আমরা শিক্ষার উন্নয়ন মানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অবকাঠামো নির্মাণ বুঝি। আর দেশের উন্নয়ন মানে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট এবং দালান-কোঠা বানানো বুঝি।

আমরা আমাদের নাগরিকদের সত্যিকারের সঠিক শিক্ষা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি বলেই আমরা এমন করে বুঝি। যদি সত্যিকারের যুগোপযোগী শিক্ষা দিতে পারতাম, তাহলে আমাদের আমলাদের শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের জন্য কারণে-অকারণে বিদেশে দৌড়াতে হতো না।

সামান্য রোগে আমাদের রোগীদের বিদেশে দৌড়াতে হতো না। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে একসময় তল্পিতল্পাসহ বিদেশে চলে যেতে হতো না। আমলা তো কেবল বাংলাদেশই নয়, পৃথিবীর সব দেশেই আছে।

পৃথিবীর কোন দেশের আমলারা ঘাস, চাষ শিখতে, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের জন্য ক্যামেরা কিনবে সেই ক্যামেরা দেখতে, বিভিন্ন দেশের ভবন দেখতে বিদেশে যায়? এসবই প্রমাণ করে তারা শিক্ষাজীবনে কোনো কিছুই শিখেনি।

যার জন্য কিছু করতে বললেই তাকে বিদেশে গিয়ে শিখে এসে করার অজুহাত দেখাতে হয়। সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি বলেই তাদের আত্মসম্মানবোধ এতো কম।

আর কম বলেই লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে এরকম সিলি বিষয়ে বিদেশে দৌড়ায়।
শিখবে কীভাবে?

তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ক্লাসের পড়া রেখে এমপিথ্রি আর গাইড বই পড়ে। বর্তমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য হলো বিসিএস পরীক্ষা দেওয়া আর পাস করা। দুনিয়ার সত্যিকারের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই।

নিজেদের গড়ে তোলার জন্য খেলাধুলা, গানবাজনা, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের কোনোই আগ্রহ নেই। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের শিক্ষকদের আর রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের। আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারিনি।

যদি পারতাম, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের চোখ থাকতো গ্লোবাল নলেজের দিকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে ব্যর্থ হয়েছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনে দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান সবার নিচে।

কেন নেই? এই প্রশ্নের উত্তরও আমরা খুঁজে দেখি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরুন। যতোই দিন যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে আমরা ততোই পিছিয়ে পড়ছি। এই ইনডেক্সকে অস্বীকার করে আমরা আরও ক্ষতি করছি। অস্বীকার করা মানে বালুর নিচে মাথা ঢুকিয়ে সমস্যা না দেখার চেষ্টা যা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গত বছর গবেষণায় আমাদের স্কোর ছিলো ৮ এর উপরে আর এই বছর ৭-এর একটু উপরে। এরকমভাবে গত ৩০ বছর ধরে আমরা কেবল নামছিই নামছি।

বিশ্ববিদ্যালয় ভালো হবে কীভাবে? ৩৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ৭০০-৮০০ কোটি বরাদ্দ দেয় সেই বিশ্ববিদ্যালয় যে টিকে আছে সেটাই অষ্টমাশ্চর্যের বিষয়।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে তাদের একটি ফ্যাকাল্টি, এমনকি একটি বিভাগের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সহজে মানসম্পন্ন করার প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেরিটোক্রেসি চালু করুন আর ইন্সেন্টিভ ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে বয়সকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করুন।

জাতীয়তা দেখে নিয়োগ হওয়া উচিত না। যেকোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত দেওয়া হয়, প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সাথে যায় না।

গার্মেন্টসে বিদেশি কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া গেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দেশি হোক বিদেশি হোক যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি।

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই নানা দেশের, নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষ থাকবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসেবে বিদেশি আছে কিনা তা ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং নির্ধারণীতে একটা উল্লেখযোগ্য পারমিটার।

বিদেশি শিক্ষক, দেশি শিক্ষক, প্রবাসী শিক্ষক সবই থাকতে পারে এবং থাকা উচিত।

শুধু দেশি থাকলে রাজনীতি, দুষ্টামি, স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি চালাতে সহজ হয়। আমরা তো কেবল দেশি দেখি না। সাথে দেখি প্রার্থী নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনা। কী যে একটা ফালতু প্রথা, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আমরা একটা ভিসিয়াস সাইকেলে ঘুরপাক খাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যতো খারাপ হবে, ততোই এখান থেকে যারা পাশ করে কর্মজীবনে যাবে তাদের মান খারাপ হবে।

আর তারা যদি আমলা হয়, ততোই তারা শিক্ষার গুরুত্ব কম বুঝবে ফলে বিশ্ববিদ্যালয় আরও খারাপ হবে।

– কামরুল হাসান মামুন
অধ্যাপক
ঢাবি